আরিশা — ৭
October 14, 2026, 11:40 PM (GMT+6)
আরিশা তার বাকি জীবনটা আরিয়ানের সঙ্গে কাটাতে চায়। কারণ, আরিয়ানই একমাত্র মানুষ, যে তার মনের কথাগুলোকে গুরুত্ব দেয়, তার অনুভূতিগুলো বোঝার চেষ্টা করে। আরিশা বিশ্বাস করে, আরিয়ানই পারবে তাকে সারাজীবন নিজের বুকে আগলে রাখতে।
আর কিছুদিন পরেই তাদের HSC পরীক্ষা শুরু হতে চলেছে। অথচ আরিশার কাছে সেই পরীক্ষা যেন পায়ের তলায় অজান্তে পিষে যাওয়া এক পিঁপড়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। সে বিশ্বাস করে, পরীক্ষায় ভালো নম্বর তাকে আর যাই দিক, সুখ দিতে পারবে না—সুখ তো কেবল আরিয়ানই তাকে উপহার দিতে পারবে।
চারদিকে যখন সবাই আগামী পরীক্ষার দুশ্চিন্তায় ব্যস্ত, তখন আরিশা আর আরিয়ান কলেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিজেদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নিয়ে আলোচনা করছে—কীভাবে তারা একসঙ্গে নতুন জীবন শুরু করবে।
আরিয়ানের পরিকল্পনা—কোনোভাবে পরীক্ষায় পাস করে সে বিদেশে চলে যাবে। সেখানে তার এক ব্যবসায়ী খালুর সাহায্যে একটা চাকরি জোগাড় করবে। তারপর ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে। আর সেই জীবনের সঙ্গী হবে আরিশা। যে জীবনে আরিশাকে তার পরিবারের অভাব-অনটন কিংবা মানসিক কষ্টগুলো নিয়ে আর ভাবতে হবে না—আরিয়ানের সঙ্গেই নিজের একটা সংসার হবে তার।
আরিশা একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করে, “আমাদের কি পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করাটা ঠিক হবে?”
“তুমি কি মনে করো তোমার বাবা-মা আমাদের স্বাভাবিকভাবে বিয়ে করার অনুমতি দেবেন?”
“না। কিন্তু... তাহলে তোমার পরিকল্পনা কী?”
“শোনো, আমার এক খালুর কথা বলেছিলাম না? যিনি আমার চাকরির ব্যবস্থা করে দেবেন?”
“হ্যাঁ, মনে আছে।”
“উনি সৌদির নাগরিক। যেভাবেই হোক, একটা ভিসার ব্যবস্থা আমার হয়েই যাবে। তারপর ধীরে ধীরে পরিশ্রম করতে থাকলে একদিন না একদিন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাব।”
“হুমম।”
“আর উনার ছেলে জারিফ ভাইয়ের বরিশালে নিজেদের একটা পাঁচতলা বাড়ি আছে। আমি বিদেশে যাওয়ার আগপর্যন্ত উনি আমাদের সেখানে থাকার ব্যবস্থা করে দেবেন। এ নিয়ে আমি ওনার সঙ্গে কথাও বলেছি। তারপর বিদেশে গিয়ে আমার বেতন একটু বাড়লে তোমাকেও নিয়ে যাব। ঠিক আছে?”
“হ্যাঁ। কিন্তু আমরা বরিশালে যাব কীভাবে?”
“সেই ব্যবস্থাও জারিফ ভাই করে দেবেন। উনি আগে থেকেই আমাদের জন্য বাসের টিকিট কেটে রাখবেন। আমরা শুধু বরিশালে গিয়ে ওনার বাসায় উঠব। সবকিছু আগে থেকে ঠিক করা থাকবে, তাই কেউ আমাদের নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবে না।”
“আচ্ছা, ঠিক আছে।”
“যদিও জারিফ ভাই একটু কড়া মেজাজের মানুষ। উনি আমাদের থাকতে দেবেন ঠিকই, তবে বিনা ভাড়ায় নয়। বাসাভাড়াটা আমার খালু দেবেন।”
আরিশা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর তার কণ্ঠে একটু স্বস্তির সুর ফুটে ওঠে।

“আসলেই, তোমার পরিকল্পনাটা তো ভালোই হয়েছে। তোমার বড়লোক খালু আর খালাতো ভাই আমাদের সাহায্য করলে আর কোনো চিন্তাই থাকবে না।”
“হ্যাঁ। তুমি শুধু শেষ পরীক্ষার দিন আমার সঙ্গে রওনা দেবে। আমরা বিয়ে করব, তারপর একসঙ্গে থাকব। আর একদিন তোমার বাবা-মা জানতে পারবেন যে তুমি একজন ধনী প্রবাসীর স্ত্রী। তখন আর তাঁদের কিছুই বলার থাকবে না।”
কথাগুলো বলতে বলতে আরিয়ানের চোখেমুখে যেন এক নতুন জীবনের স্বপ্ন ফুটে ওঠে। আরিশার মনেও ধীরে ধীরে সেই স্বপ্নের রং ছড়িয়ে পড়ে। তাদের কাছে ভবিষ্যতটা আর ততটা দূরের মনে হয় না। যে জীবনের জন্য তারা এতদিন অপেক্ষা করে এসেছে, যে জীবনে থাকবে নিজেদের একটা ছোট্ট সংসার, পরস্পরের সঙ্গ আর ভালোবাসা—সেই জীবন যেন আর মাত্র কয়েকটা দিনের অপেক্ষায়। তারা দুজনেই বিশ্বাস করে, আর কিছুদিন পরই সবকিছু বদলে যাবে।