আরিশা — ৫
October 8, 2026, 11:00 PM (GMT+6)
বৃষ্টি এখনো পুরোপুরি থেমে যায়নি। প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটায় যেমন কলেজের রাস্তার দুপাশের ফুলগুলো ক্রমশ আরও চকচকে ও সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে উঠছে, তার চেয়েও বহুগুণ বেশি সৌন্দর্যের ঝলক ফুটে উঠছে আরিশার গাল দুটিতে। আরিয়ানের সঙ্গে কথা বলার সময় কিছুক্ষণ পরপরই হেসে উঠছে সে—কখনো লজ্জায়, কখনো বা আরিয়ানের কোনো মজার কথা শুনে।
কয়েক মুহূর্ত আরিশার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে আরিয়ান বলল, “আজ তো বেশ মজা করলাম দুজনে। এবার চলো বাসায় ফেরা যাক। দেরি হলে তোমার বাবা-মা হয়তো দুশ্চিন্তা করবেন।” কথাগুলো বলার সময় আরিয়ানের মনে হলো, যেন সে নিজের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান কিছু হারাতে চলেছে।
“হ্যাঁ, চলো। কিন্তু বৃষ্টি তো এখনো থামেনি।”
“আমার কাছে ছাতা আছে। দুজনের জন্য হয়তো একটু ছোট হয়ে যাবে, তবে কাছাকাছি হয়ে হাঁটলে সমস্যা হবে না।”
কথা শেষ করে দুজনে কলেজ থেকে বেরিয়ে একই ছাতার নিচে হাঁটতে শুরু করল। এই প্রথম তারা এতটা কাছাকাছি থেকে হাঁটছে, এবং এই প্রথম আরিয়ান নিজের ছাতা মাথায় দিয়ে এমনভাবে চলছে যে তার ডান হাত বৃষ্টির পানিতে ভিজে গিয়ে শরীরের চামড়ার সাথে শার্টের কাপড় একদম লেগে গেছে।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর আরিশা কৌতূহলী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, আরিয়ান, কোন জিনিসটা তোমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়?”
“তোমাকে ছাড়া এক মুহূর্ত বেঁচে থাকা।”
আরিশা লজ্জায় মুচকি হেসে বলল, “আরে ধ্যাত! সিরিয়াসলি বলো।”
“আমার কথাটা কি তোমার সিরিয়াস মনে হলো না?”
“আচ্ছা, ঠিক আছে। এটা বাদে অন্য কোন জিনিসটা তোমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়?”
আরিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল, “বিশ্বাসঘাতকতা।”
আরিশা অবাক চোখে তার দিকে তাকাল।
আরিয়ান আবার বলল, “আমার কাছে বিশ্বাস পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস। একবার বিশ্বাস ভেঙে গেলে শত চেষ্টা করেও তাকে আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় না। ভাঙা কাচের টুকরোগুলো জোড়া লাগানো গেলেও তাতে আগের সেই অখণ্ডতা ফিরে আসে না।”
কথা বলতে বলতেই হঠাৎ রাস্তার ডান পাশে ফুটে থাকা জুঁইফুলের একটি থোকায় চোখ পড়ল তার।
“একটু দাঁড়াও।”
কথাটি বলে আরিয়ান ডান দিকে হাত বাড়িয়ে একটি জুঁইফুল ছিঁড়ে নিল। আরিশা লক্ষ করল, তাকে বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে গিয়ে আরিয়ান নিজের ডান হাতটাকে পুরোটা সময় বৃষ্টিতে ভিজতে দিয়েছে। ফুলটি তুলতে গিয়ে হাতটা আরও ভিজে গেল। আরিশার কিছু একটা বলতে ইচ্ছে হলো, কিন্তু কথাগুলো যেন ঠোঁট পর্যন্ত এসেও আটকে গেল।
এদিকে ফুলটি হাতে নিয়ে আরিয়ান আলতো করে আরিশার কানের পাশে গুঁজে দিল। তারপর মৃদু হেসে বলল, “মহাবিশ্বের সকল নক্ষত্রকে যদি একসঙ্গে তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী করা হয়, আর আমাকে সৌন্দর্যের ভিত্তিতে একজনকে বেছে নিতে বলা হয়, তবে আমি বারবার তোমাকেই বেছে নেব।”
লজ্জায় আরিশার গাল দুটো আরও লাল হয়ে উঠল। প্রকৃতির কোনো এক অদ্ভুত লীলায় ঠিক তখনই বৃষ্টি থেমে গেল। ধীরে ধীরে মেঘ সরে আকাশ পরিষ্কার হয়ে উঠল।

বাসায় ফিরে ভেতরে প্রবেশ করার আগেই আরিশা কান থেকে ফুলটি খুলে ব্যাগের ভেতর যত্ন করে রেখে দেয়—যেন কেউ দেখে না ফেলে। ঘরে ঢুকে সে ফুলটি বের করে। তারপর অত্যন্ত যত্নে ডায়েরির পাতার ভাঁজে রেখে ডায়েরিটি এমনভাবে লুকিয়ে রাখে, যেন সেটি পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্লভ কোনো সম্পদ।
মানুষ যেমন টাকা-পয়সা কিংবা সোনা-হিরার গয়না আগলে রাখে, আরিশা যেন তার চেয়েও বেশি যত্নে আগলে রাখে সামান্য একটি জুঁইফুল। কারণ, আরিশার কাছে আরিয়ানের দেওয়া এই ছোট্ট ফুলটি পৃথিবীর সমস্ত গয়নার চেয়েও মূল্যবান।
ফুলটি যতক্ষণ তার কাছে আছে, আরিয়ানও যেন ততক্ষণ তার পাশেই রয়েছে। ফুলটির দিকে তাকালেই তার মনে হয় আরিয়ান তার ঠিক পাশটিতে বসে আছে—ঠিক যেমন করে সে কিছুক্ষণ আগেও একই ছাতার নিচে তার পাশে হেঁটে চলছিল।