FrAcTuRe

Fragments of My Life

আরিশা — ২

আরিশা — ৩

October 6, 2026, 11:50 PM (GMT+6)

আরিশাদের বাসার দরজাটা দেখলে মনে হবে যেন শত বছর আগে কোনো দুর্ঘটনায় মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা এক নোংরা, নড়বড়ে, মৃতপ্রায় বস্তু। সত্যি বলতে, তারা যে বাসায় থাকে, সেটাও প্রায় নব্বই বছরের পুরোনো।

প্রতিদিনের মতোই আরিশা দরজার বাঁ পাশে থাকা কলিং বেলে চাপ দেয়; এবং প্রতিদিনের মতোই তানজিলা বেগম কিছুক্ষণ পর এসে দরজা খুলে দিয়ে এমনভাবে উধাও হয়ে যান যেন আরিশার এপাশ থেকে মনে হয় দরজাটি আপনা-আপনিই খুলে গেছে।

বাসায় ঢুকে নিজের ঘরে পৌঁছানো পর্যন্ত এই সামান্য সময়টুকুর মধ্যে আরিশার কানে ভেসে আসে তার মা-বাবার মধুর বাণী।

তানজিলা বেগম তাঁর স্বামীকে বলেন, “ভাত রান্না করব কী দিয়ে? ঘরে কিছু নেই। বাজার করে নিয়ে আসো যাও।”

“আমার কাছে এখন টাকা নেই। আর এক বেলা না খেলে মানুষ মারা যায় না।”

“বউ-বাচ্চাদের যদি এক বেলা খাওয়াতেই না পারো, তাহলে বিয়ে করেছিলে কেন?”

শেষ পর্যন্ত ঘরে যা ছিল, তা দিয়েই রান্না হলো—আলুভর্তা।

আরিশা খাবারদাবার নিয়ে কখনো বিলাসিতা করে না। হজমযোগ্য যেকোনো খাবারই সে খেয়ে নিতে পারে। ছোটবেলা থেকে সাধারণ বাঙালি খাবার খেতে খেতেই বোধ হয় বিদেশি নামীদামি খাবারের প্রতি তার একধরনের অরুচি জন্মে গেছে।

আরিশার দিনের বাকি অংশটুকুও নিয়মমাফিক কাটে—পড়তে বসা, কোচিংয়ে যাওয়া, বাসায় ফিরে নাশতা করা, তারপর আবার পড়তে বসা,… ইত্যাদি। এভাবেই তার জীবনের প্রায় প্রতিটি দিন চোখের পলকে একের পর এক হারিয়ে যায়, অথচ হারিয়ে যাওয়ার মুহূর্তগুলোতে বিশেষ কিছুই ঘটে না।

কাউকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের স্মৃতি কোনটি, কিংবা সবচেয়ে দুঃখের মুহূর্ত কোনটি—তাহলে হয়তো অনেক ভেবেচিন্তে হলেও সে কোনো একটি দিনের কথা মনে করতে পারবে। কিন্তু আরিশার পক্ষে এমন কোনো দিনের কথা মনে করা একেবারেই অসম্ভব, যে দিনটি তাকে সত্যিকারের আনন্দ দিয়েছিল। কারণ, যে স্মৃতির মস্তিষ্কে আদৌ কোনো অস্তিত্ব নেই, শত চেষ্টা করেও তা ফিরিয়ে আনা যায় না।

আর দুঃখের স্মৃতি?

‘স্মৃতি’ বলতে আমরা সাধারণত অতীতে ঘটে যাওয়া এমন কোনো ঘটনাকে বুঝি, যার প্রভাব বর্তমানে হয়তো আর না থাকলেও একসময় তা এতটাই গভীর ছিল যে মস্তিষ্ক তাকে ভুলতে পারেনি। কিন্তু সেই ঘটনাই যদি অতীতের অংশ না হয়ে বর্তমানে কারও জীবনের প্রতিদিনের সঙ্গী হয়ে ওঠে, তাহলে তাকে আদৌ স্মৃতি বলা যায় কি না, তা নিয়ে আমার অশিক্ষিত বিবেক নিশ্চিত নয়।

আরিশা — ৪