আরিশা — ১১
October 18, 2026, 11:00 PM (GMT+6)
সকালবেলায় পাখির কিচিরমিচির শব্দে আরিশার ঘুম ভাঙে। চোখ মেলেই সে তাকায় পাশের জানালার দিকে। সূর্যের সোনালি আলো এসে আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছে তার মুখ—যা তার কোমল ত্বককে যেন কোমলতর করে দিচ্ছে। অন্যদিকে ফিরতেই চোখে পড়ে তার সবচেয়ে কাছের মানুষটিকে। যে মানুষটিকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, সেই পাশের বালিশে মুখ হাঁ করে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। দৃশ্যটা দেখে আরিশার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে।
সে উঠে বসে কিছুক্ষণ আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে থাকে। যে মানুষটা একসময় কেবল তার কলেজের বন্ধু ছিল আজ সে তার স্বামী—তার সুখ-দুঃখের সঙ্গী। কথাটা ভাবতেই আরিশার ঠোঁটের হাসি আরও একটু গভীর হয়ে যায়। সে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে আরিয়ানের হাঁ করা মুখটার দিকে।
আরিশার নড়াচড়ায় আরিয়ানের ঘুম ভেঙে যায়। চোখ খুলে তাকে বসে থাকতে দেখে সে যেন আঁতকে ওঠে। তড়িঘড়ি উঠে বসে বলে, “এই! তুমি উঠেছ কেন? তোমার না শরীর খারাপ! শুয়ে থাকো। আমি খাবারের ব্যবস্থা করছি।”
আরিশার গায়ে বেশ জ্বর। শীতের মধ্যে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে তার প্রচণ্ড ঠান্ডা লেগেছে। অথচ আরিয়ানের এমন ব্যস্ততা আর উদ্বিগ্ন মুখ দেখে তার মনে হয়, শরীরের সমস্ত অসুস্থতা যেন মুহূর্তের জন্য দূরে সরে গেছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আরিয়ান এক বাটি গরম স্যুপ নিয়ে ফিরে আসে। স্ত্রীর পাশে বসে চামচে করে একটু একটু করে তাকে খাইয়ে দিতে থাকে।
আমাদের দেশে বিয়ের সময় খুব কম নারীই হয়তো এমনটা আশা করেন যে একদিন তার স্বামী নিজের হাতে রান্না করে তাকে খাওয়াবে, অসুস্থ হলে পাশে বসে যত্ন নেবে। বরং তাদের মনে এই ধারণাই গেঁথে থাকে যে, স্বামীর সেবা-যত্ন করেই কাটিয়ে দিতে হবে জীবনের বাকি দিনগুলো। অথচ আরিয়ান যেন সেই চেনা ধারণার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।
আরিশা এক চামচ করে স্যুপ খায়, আর মায়াভরা চোখে তাকিয়ে থাকে আরিয়ানের দিকে।
“আমি তো নিজেই খেতে পারতাম।”
“তাতে কী? আমি থাকতে তুমি কষ্ট করবে কেন?”
পরেরবার আরিয়ান চামচটা তার মুখ থেকে সরিয়ে নিতেই সুযোগ বুঝে আরিশা তার গালে ছোট্ট একটা চুমু বসিয়ে দেয়। আরিয়ান মুচকি হেসে আড়চোখে একবার তার দিকে তাকায়। তারপর আবার আগের মতোই স্যুপ খাওয়াতে থাকে—যেন তাদের ভালোবাসার এমন ছোট ছোট প্রকাশ খুবই স্বাভাবিক, যেন এভাবেই একে অপরের কাছে ভালোবাসা পৌঁছে দেওয়া তাদের প্রতিদিনের অভ্যাস।
স্যুপ খাওয়ানো শেষ হলে আরিয়ান বাটিটা পরিষ্কার করতে রান্নাঘরে চলে যায়। আরিশা বিছানায় বসে হাঁটু দুটো ভাঁজ করে তার ওপর হাত রেখে সামনের দিকে ঝুঁকে থাকে। তার চোখেমুখে তখন এক অদ্ভুত বিস্ময়। মনে মনে ভাবে, জীবনে এমন কী ভালো কাজ সে করেছিল, যার প্রতিদান হিসেবে সৃষ্টিকর্তা তাকে এমন একজন জীবনসঙ্গী উপহার দিলেন?