FrAcTuRe

Fragments of My Life

আরিশা — ১

October 4, 2026, 11:20 PM (GMT+6)

ভোরবেলা যখন নানান প্রজাতির পাখির ঝাঁক কিচিরমিচির করে গান গাইতে থাকে, জলপ্রপাতের অবিরাম জলধারা যখন পাথরের গায়ে জমে থাকা সমস্ত আবর্জনা ধুয়ে নিয়ে গিয়ে সৃষ্টি করে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের, কিংবা বৃষ্টির ঝমঝম শব্দে যখন সন্ধ্যার প্রকৃতি ভিজে ওঠে এক অসীম রোমাঞ্চে—এসব কিছুর চেয়েও হাজার গুণ বেশি রোমাঞ্চকর, হাজার গুণ বেশি সুরেলা হলো আরিশার কণ্ঠের সেই হৃদয়জুড়ানো আওয়াজটি।

আরিশা খুব ভালো গান গাইতে জানে। কিন্তু পারিবারিক চাপের কারণে তার সেই প্রতিভার বিকাশ হওয়া তো দূরের কথা, গান গাওয়াও যে তার দ্বারা সম্ভব, সেই ভাবনাটুকু পর্যন্ত সে নিজের মনে স্থান দিতে নারাজ। অথচ কেউ যদি কোনো দিন আরিশার কণ্ঠে একটি গানও শুনে থাকেন, তবে তিনি হয়তো নিজের অজান্তেই গানের কথাগুলো থেকে মনোযোগ সরিয়ে আরিশার সুমধুর কণ্ঠে বিহ্বল হয়ে পড়তেন।

কারও মনে যদি একবারও প্রশ্ন জেগে থাকে—একজন মানুষের কণ্ঠ আর কতটুকুই বা সুমধুর হতে পারে, যার জন্য এত প্রশংসা?—তাহলে আরিশার রূপের প্রশংসা নাহয় আর নাই করলাম—হয়তো আপনারা বিরক্ত হয়ে যাবেন।

তাছাড়া, তার রূপের বর্ণনা দিতে গিয়ে আমার যতটা সময় লাগবে, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগবে সেই সৌন্দর্যকে ভাষায় প্রকাশ করার মতো শব্দ খুঁজে পেতে। কারণ, সকল ভাষার মধ্যেই সৌন্দর্য আছে বটে, কিন্তু পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য মুখের ভাষা সবসময় যথেষ্ট হয় না।

নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র মেয়ে আরিশা। ঢাকার শহরে নিম্ন-মধ্যবিত্ত আর দরিদ্র মানুষের জীবনযাপনের মধ্যে আদৌ যে খুব একটা পার্থক্য আছে, তা আমার অন্তত মনে হয় না।

আরিশার মা-বাবা প্রায়ই তাকে আশীর্বাদ করেন এই বলে, “হয় তুই ভালো করে পড়াশোনা করে ভালো মানের কোনো চাকরি-বাকরি করবি, না হয় তোকে জোর করে কোনো বুড়ো রিকশাওয়ালার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেব। তখন শ্বশুরবাড়ির ঠেলা বুঝবি!”

তানজিলা বেগম আর রফিক মণ্ডলের তাঁদের একমাত্র মেয়ের প্রতি পড়াশোনার ব্যাপারে এতটা কঠোর হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাঁদের কাছে আরিশাই পরিবারের ভবিষ্যতের একমাত্র আর্থিক ভরসা। মেয়ের ভবিষ্যৎকে ঘিরে তাঁদের প্রত্যাশার অন্ত নেই। অথচ সেই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মেয়েটির নিজের কী ইচ্ছা, তা নিয়ে তাঁদের বিশেষ কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না।

আরিশা খুবই সাধারণ মানের একজন ছাত্রী। সে কখনো ক্লাসে প্রথম হয়নি, আবার কখনো ফেলও করেনি। অথচ তার মা-বাবার চোখে সে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ ছাত্রী।

হয়তো তাঁরা দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝেননি। অবশ্য না বোঝাটাই বা অস্বাভাবিক কী? আরিশা যে সোনার দাঁত! আর সোনার মতো মূল্যবান কোনো কিছুর যথার্থ মর্যাদা বোঝার যোগ্যতা সবার থাকে না—তাকে আগলে রাখার সামর্থ্যও সবার থাকে না।

আরিশা ভীষণ লাজুক প্রকৃতির মেয়ে। কারও সঙ্গে খুব একটা কথায় জড়ানোর অভ্যাস তার নেই—মা-বাবার সঙ্গে তো একেবারেই নয়। মুখে সে খুব বেশি কথা না বললেও, তার চোখের দৃষ্টিতে যেন পৃথিবীর সমস্ত সাহিত্য এসে আশ্রয় নেয়। যেন কত শত না-বলা কথা, কত অপ্রকাশিত অনুভূতি, কত অনুচ্চারিত কবিতা নীরবে জমা হয়ে আছে তার চোখের গভীরে।

আরিশা — ২