FrAcTuRe

Fragments of My Life

আরিশা — ৫

আরিশা — ৬

October 10, 2026, 11:00 PM (GMT+6)

আজ সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর দৈনন্দিন কোনো কাজ শুরু করার আগেই আরিশা প্রথমে তার ডায়েরিটা খুলে বসে। গতকাল আরিয়ানের দেওয়া ফুলটির দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নেয় সে। যেন ওই ফুলটিই তার সৌভাগ্যের চাবিকাঠি—সকালে একবার ফুলটির দিকে তাকাতে পারলেই তার পুরো দিনটা হয়তো ভালো কাটবে। ফুলটির দিকে তাকিয়ে আরিশার কোমল গোলাপি ঠোঁটে যে মিষ্টি হাসি ফুটে ওঠে, তা যেন ফুলটির সৌন্দর্যকেও হার মানায়।

Arisha

এমন সময় রান্নাঘর থেকে তার মায়ের চিৎকার ভেসে আসে, “কিরে! কলেজের জন্য রেডি হবি না?” আরিশা তাড়াতাড়ি ডায়েরিটা বন্ধ করে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।

কলেজে পৌঁছে সে দেখে, আরিয়ান এখনো আসেনি। ক্লাসে বসে বারবার দরজার দিকে তাকায় সে। অপেক্ষা করে, কখন আরিয়ান আসবে, কখন দেখা হবে তার সঙ্গে।

অবশেষে আরিয়ান ক্লাসে প্রবেশ করে। তাকে দেখেও না দেখার ভান করে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে আরিশা। আরিয়ান নিজের ব্যাগটা রেখে তার বেঞ্চের কাছে এসে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করে, “আমার জন্য অপেক্ষা করছ?”

আরিশা অবাক হয়ে বলে, “কই, না তো!”

“আসলেই?”

“এমনি ভাবছিলাম আরকি—আজ তোমার আসতে এত দেরি হচ্ছে কেন।”

“ওটাকেই তো অপেক্ষা করা বলে।”

আরিশা মুচকি হেসে বলে, “হয়তো... তুমি ছাড়া আর কার জন্য অপেক্ষা করব?”

কথাটা বলার সময় তার ঠোঁটে লেগে থাকে এক চিলতে হাসি।

কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে আরিয়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে আরিশার মনে হয়, আজ তার মন ভালো নেই। আগের দিনগুলোর মতো নিজের আগ্রহে কথা বলতে এগিয়ে আসছে না সে। তার চোখেমুখে যেন কেমন একটা হতাশা।

আরিশা জিজ্ঞেস করে, “তোমার কি কোনো কারণে আজ মন খারাপ?”

কয়েক মুহূর্ত আরিশার চোখের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে আরিয়ান বলে, “আমি তো তোমাকে বলেছি, আমার মন কখনো খারাপ হয় না।”

আরিশা এত দিনে বুঝে গেছে, আরিয়ান নিজের মনের কষ্ট সহজে কারও কাছে প্রকাশ করতে চায় না। কিন্তু আরিশা তো আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতো নয়। অন্তত ভালোবাসার মানুষটির কষ্টের কাছে সে হেরে যেতে চায় না। আরিয়ানের মনের ভার লাঘব করতে সে যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। আরিয়ান নিজে থেকে কিছু না বললেও, তার নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কষ্টটুকু বুঝতে চায় সে।

“ফালতু কথা বলো না। তোমার ভেতরে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো কষ্ট আছে।”

“সবার জীবনেই তো কিছু না কিছু কষ্ট থাকে।”

“তার মানে তোমারও কষ্ট আছে, যে কারণে আজ তোমার মন খারাপ।”

“জীবনে কষ্ট থাকলেই কি মন খারাপ করে থাকতে হবে?”

আরিশা আর কী বলবে বুঝতে না পেরে চুপ করে যায়।

কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর আরিয়ান নিজেই বলে ওঠে, “আসলে, আমার বয়স যখন পনেরো, তখন একটা বাস দুর্ঘটনায় আমার মা-বাবা দুজনেই মারা যান। সেই থেকে আমি চাচার বাসায় আশ্রিত হয়ে আছি। তাদের এক ছেলে, এক মেয়ে আছে। এমনিতেই অভাবের সংসার। সেখানে আমিও যেন একটা বাড়তি বোঝা—অন্তত তাদের আচরণে তো সেটাই মনে হয়।”

একটু থেমে আবার বলে, “সংক্ষেপে বলতে গেলে, তোমার মা-বাবা যেমন আশা করেন তুমি পড়াশোনা শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হবে, ভালো একটা চাকরি করবে, আমার চাচা-চাচি প্রত্যাশা করেন আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের সংসারের একটা বোঝা কোমাই।”

কথাগুলো শুনে আরিশার চোখে প্রায় জল এসে যায়। আরিয়ানের প্রতি তার হৃদয়ে জমে থাকা মায়া যেন মুহূর্তেই আরও গভীর হয়ে ওঠে। ছেলেটার হাসির আড়ালে এতটা কষ্ট লুকিয়ে আছে, তা সে আগে কখনো কল্পনাও করেনি।

আরিয়ান আবার বলে, “আমি স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। আমার এক খালাতো ভাই আমাকে সৌদি আরবে পাঠানোর ব্যবস্থা করছে। HSC পরীক্ষার পর হয়তো দেশের বাইরে চলে যেতে পারব। ভাইয়ের অনেক পরিচিত মানুষ আছে, তাই সেখানে একটা ভালো চাকরি পাওয়ারও আশা আছে। সেই জন্যই এখন থেকে নিজের দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করছি।”

কথা বলতে বলতে আরিশার হাতটা ধরে আরিয়ান বলে, “আমি বিশ্বাস করি, একদিন আমরা নিজেদের স্বপ্নগুলো পূরণ করে স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারব। তুমি কি বিশ্বাস কর?”

Arisha

আরিশা কোমল দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলে, “হ্যাঁ, আমিও বিশ্বাস করি।”

আরিয়ান কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে, “তুমি তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে কী চাও?”

আরিশা কিছুক্ষণ ভাবে। তারপর শান্ত স্বরে বলে, “আমি তো খুব বেশি কিছু চাই না। টাকা-পয়সার প্রতিও আমার তেমন আগ্রহ নেই। আমি শুধু এমন একজন মানুষের সঙ্গে বাকি জীবনটা কাটাতে চাই, যে আমাকে বুঝবে, আমার পাশে থাকবে, আর ভালোবাসা দিয়ে আমাকে আগলে রাখবে। যার কাছে আমাকে নিজের মনের কথাগুলো লুকিয়ে রাখতে হবে না।”

কথাগুলো বলার পর আরিশা আর কিছু বলে না। আরিয়ানও নীরব থাকে। তারা দুজনেই কিছুক্ষণ একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেই নীরব দৃষ্টিবিনিময়ের মাঝে যেন ধীরে ধীরে জন্ম নেয় এক অনুচ্চারিত প্রতিশ্রুতি।

আরিশা — ৭