আরিশা — ৪
October 7, 2026, 5:30 PM (GMT+6)
অন্ধকার সকাল, বাইরে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি—সেই বৃষ্টির মধ্য দিয়েই ছাতা মাথায় দিয়ে কলেজের দিকে রওনা হলো আরিশা।
কলেজের পরিবেশে সে কোনোদিনই খুব একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করে না। প্রতিদিন একই দরজা দিয়ে প্রবেশ করা, একই বেঞ্চে গিয়ে বসা, একইভাবে শিক্ষকের লেকচার আনমনে শুনে যাওয়া—সবকিছু যেন একই চক্রে ঘুরতে থাকে। কোনো কিছুতেই তার বিশেষ আনন্দ নেই।
তবে আজ সে একটু আগেই কলেজে চলে এসেছে। কারণ আরিশার বৃষ্টি ভালো লাগে। বৃষ্টি নামলে তার মনে হয় গোটা পৃথিবী যেন তার বেদনার সঙ্গী হয়ে উঠেছে—আকাশও যেন তার হয়ে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। বৃষ্টি এলেই সে জানালার পাশে কিংবা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণের জন্য হলেও তার হৃদয়ে জমে থাকা না-বলা যন্ত্রণাগুলো বৃষ্টির স্বচ্ছ জলের সঙ্গে মিশে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। মনে হয়, কোনো এক স্বর্গীয় তরল এসে তার সমস্ত কষ্ট ধুয়ে-মুছে নিয়ে যাচ্ছে।

ক্লাসরুমের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতেই আরিশা দেখল, আরিয়ান আগে থেকেই সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। সেও যেন একমনে বৃষ্টির সুর উপভোগ করছে।
“কেমন আছো, আরিশা?”
“ভালো আছি। তুমি?”
“আমি সবসময়ই ভালো থাকি। আমার মন খারাপ করার ক্ষমতা কারও নেই!”
আরিশা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “যারা বলে তাদের কখনো মন খারাপ হয় না, তাদের মনই সবচেয়ে বেশি কষ্টে ভোগে।”
“তুমি এত নিশ্চিত কীভাবে?”
“মনে হলো তাই।”
“মনে হলেই কি আর হয়! সবকিছুর মধ্যেই কোনো না কোনো ব্যতিক্রম থাকে।”
“তা অবশ্য ঠিক।”
“যেমন তুমি।”
আরিশা ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “কীভাবে?”
আরিয়ান হেসে বলল, “কারণ পৃথিবীতে যত সুন্দরী মেয়েই থাকুক, তোমার সৌন্দর্যের কাছে সবাই যেন ম্লান হয়ে যায়।”
আরিশা অন্যদিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে মুচকি হাসল, “আরে নাহ্!”
আরিয়ান সাধারণ প্রশ্ন করতে অভ্যস্ত নয়। তার প্রশ্নগুলো একটু অদ্ভুত—কখনো কখনো হয়তো বিরক্তিকরও। তবে আরিশার কাছে সেগুলো বিরক্তিকর লাগে না, বরং ভালোই লাগে।
কিছুক্ষণ পর আরিয়ান জিজ্ঞেস করল, “আমি যদি বলি, এখন আমার মন খারাপ—তাহলে তুমি আমাকে খুশি করার জন্য কী করবে?”
আরিশা একটু ভেবে বলল, “জানি না। কী করলে তুমি খুশি হবে?”
“তুমি গান গাইলে।”
পৃথিবীর সমস্ত লজ্জা যেন একসঙ্গে এসে আরিশাকে ঘিরে ধরল।
“আমি পারব না।”
“কেন?”
“এখানে?”
“হ্যাঁ, এখানে।”
আরিশা কোনোভাবেই গান গাইতে রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু আরিয়ানের মিষ্টি অনুরোধের কাছে শেষ পর্যন্ত আর না-ও বলতে পারল না।
অবশেষে সে গান শুরু করল। ঠিক সেই মুহূর্তেই বৃষ্টিও যেন হঠাৎ তীব্র হয়ে উঠল। কিছুক্ষণের মধ্যেই গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পরিণত হলো তুমুল বর্ষণে। মনে হলো, আরিশার মধুর কণ্ঠে মুগ্ধ হয়ে প্রকৃতিও তাকে সঙ্গ দিতে শুরু করেছে।
এদিকে আরিয়ান বিহ্বল হয়ে তার গান শুনতে লাগল। তার চোখে ছিল মুগ্ধতা। মাঝে মাঝে সে এমনভাবে আরিশার দিকে তাকাচ্ছিল, যেন সে গান শুনছে না—কোনো এক অমূল্য দৃশ্য দেখছে।
গান শেষ হলো। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। আরিয়ানের ঠোঁটে ফুটে উঠল মৃদু হাসি। আরিশাও সেই হাসির জবাবে নিজের হাসিটা আর লুকিয়ে রাখতে পারল না।
আরিয়ান একটু কাছে ঝুঁকে নরম স্বরে বলল, “দেখেছ? এই এক মিনিটের জন্য হলেও তুমি নিজের মতো করে বাঁচলে। কাউকে কোনো জবাবদিহি দিতে হলো না। কাউকে খুশি করাও তোমার উদ্দেশ্য ছিল না।”
আরিশার চোখে যেন অদৃশ্য কোনো প্রশ্ন ভেসে উঠল।
আরিয়ান একটু থেমে বলল, “তুমি আমার সামনে মন খুলে কথা বলতে পারো। গানও গাইতে পারো। আমি কিছু মনে করব না। বরং খুশি হব।”
তার কণ্ঠটা এবার একটু নিচু হয়ে গেল।
“কারণ আমার সঙ্গে এমনিতেও কেউ তেমন কথা বলে না।”
আরিশা কিছু বলল না। শুধু বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল। তবু সেই মুহূর্তে তার মনে হলো—হয়তো এতদিন পর সে এমন একজন মানুষকে খুঁজে পেয়েছে, যার কাছে তাকে নিজের কষ্টগুলো লুকাতে হবে না।