আরিশা — ২
October 5, 2026, 10:40 PM (GMT+6)
আরিশা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে টেবিলের ওপর রাখা ঘড়িটির সেকেন্ডের কাঁটার দিকে। সকাল আটটা বাজে। ঘড়ির কাঁটা প্রতি সেকেন্ডে টিক টিক শব্দ করে এগিয়ে যাচ্ছে ঠিকই, অথচ আরিশার জীবনের পরিস্থিতি যেন বছরের পর বছর ধরে একই জায়গায় স্থির হয়ে আছে।
তার মা-বাবার স্বপ্নের সঙ্গে তার নিজের স্বপ্নের কোনো মিল নেই। মা-বাবা যেখানে তার ভবিষ্যৎকে সাফল্য, অর্থ আর সামাজিক প্রতিষ্ঠার মাপকাঠিতে বিচার করেন, সেখানে আরিশার চাওয়া একেবারেই ভিন্ন। সে চায়, তার জীবনে এমন কেউ আসুক, যার কাছে নির্দ্বিধায় নিজের সমস্ত কষ্টের কথা বলতে পারবে, যে তার চোখের দিকে তাকিয়ে তার না-বলা কথাগুলোও বুঝে নেবে, তারপর তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়ে আশ্রয় দেবে—আজীবনের জন্য।
অঢেল টাকা-পয়সা কিংবা ধনসম্পদের প্রাচুর্য আরিশাকে কখনোই প্রকৃত সুখ দিতে পারবে না। পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া তথাকথিত ভালোবাসার আড়ালে প্রতিনিয়ত নিজের অনুভূতিগুলোকে অস্বীকার করতে করতে সে ক্লান্ত। তার চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়। সে শুধু এমন একটুখানি ভালোবাসা চায়, যেখানে তাকে ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে না—যেখানে সে কারও প্রত্যাশা পূরণের যন্ত্র নয়।
কিন্তু বাস্তবতার কাছে তার এই চাওয়াগুলো যেন বিলাসিতা।
আরিশা যখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব অবাস্তব চিন্তায় ডুবে আছে, ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে তার মায়ের চিৎকার ভেসে আসে: “কিরে, তুই এখনো রেডি হোসনি? পাঁচ ঘণ্টা ধরে রেডি হলে জীবনে আর কী উন্নতি করবি? এতক্ষণ সময় নষ্ট না করে কিছু MCQ পড়লেও তো কাজে লাগত! পরীক্ষায় ফেল করলে চাকরিও পাবি না, আর তোর বাপের তো এত জমিজমাও নেই যে কোনো ছেলে তোকে বিয়ে করে সারাজীবন বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবে!”
আরিশার প্রতিদিনের সকাল ঠিক এমন সুন্দরভাবেই শুরু হয়। প্রতিদিনের মতো আজও তাকে মনে করিয়ে দেওয়া হলো, তার জীবনের মূল্য কতটা—আর সেই মূল্য নির্ধারণের দায়িত্ব যেন অন্য কারও হাতে।
আজ চুলায় গ্যাস নেই বলে রান্নাবান্নাও তেমন হয়নি। শুকনো একটা রুটি খেয়েই কলেজের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ে আরিশা।
কলেজেও তার জীবনটা খুব একটা আলাদা নয়। সে স্বভাবতই অন্তর্মুখী। হাতে গোনা দু-তিনজন বান্ধবী থাকলেও তারা নিজেদের অন্য বান্ধবীদের নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকে। ফলে আরিশাকে কেউ আলাদা করে খোঁজে না, তার পাশে এসে বসে না, কিংবা হঠাৎ করে জানতে চায় না—তার মনটা আজ কেমন আছে। অবশ্য কেউ নিজে থেকে এগিয়ে এসে কথা না বললে আরিশাও যে সহজে কারও সঙ্গে কথা বলতে যাবে, এমনটা আশা করা যায় না।
ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে বসে একা একা বিড়বিড় করে গান গাইছিল সে। নিজের অজান্তেই ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে সুর বেরিয়ে আসছিল। এমন সময় পাশ থেকে একটি ছেলে আগ্রহ নিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসে। ছেলেটিকে এগিয়ে আসতে দেখে আরিশা সঙ্গে সঙ্গে গান থামিয়ে দেয়।

ছেলেটি হেসে বলল, “তোমার গলার স্বর তো বেশ মিষ্টি! তুমি কি সবসময় এভাবে বিড়বিড় করে গান গাও, নাকি কোথাও গান শেখো?”
আরিশা একটু ইতস্তত করে উত্তর দিল, “না, তেমন কিছু না। একা থাকলে মাঝে মাঝে গুনগুন করি আরকি। আমার মনে হয়, সবাই জীবনে একবার হলেও এভাবে গুনগুন করে। তুমিও করো নিশ্চয়ই।”
ছেলেটি মুচকি হাসল।
চেহারার দিক থেকে ছেলেটিকে আলাদা করে সুদর্শন বলা যায় না, আবার অসুন্দরও নয়। স্বাভাবিক শারীরিক গঠন, কোঁকড়ানো চুল আর চোখে চশমা। তবে তার কথা বলার ধরনে এমন একটা স্বতঃস্ফূর্ততা আছে, যা সহজেই অন্যের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে।
ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, “তোমার নাম কী?”
“আরিশা। তোমার?”
“আরিয়ান।”
নাম বিনিময়ের পর দুজনই কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। আরিশা নিচের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। কী বলবে, বুঝে উঠতে পারছে না। এর আগে কোনো ছেলের সঙ্গে এভাবে কথা বলার অভিজ্ঞতা তার হয়নি। তার প্রতিদিনের রুটিন বলতে কলেজে আসা, শিক্ষকদের লেকচার শোনা—যার সামান্য কিছু অংশই সে বুঝতে পারে—তারপর বাড়ি ফিরে জোর করে আবার পড়তে বসা। এভাবেই দিন কাটে তার। এর বাইরে নিজের জন্য আলাদা কোনো জগৎ গড়ে তোলার সুযোগ সে কখনো পায়নি।
নীরবতা ভেঙে আরিয়ান বলল, “তোমার পরিবারের কেউ বোধহয় তোমাকে গান গাইতে তেমন উৎসাহ দেয় না, তাই না?”
আরিশা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলে, “হ্যাঁ! তুমি বুঝলে কীভাবে?”
আরিয়ান একটু হেসে বলল, “আসলে আমাদের সমাজে অন্য কারও মধ্যে ভালো কিছু দেখলে অনেকেই সেটা সহজভাবে মেনে নিতে পারে না। বরং তার প্রতিভাকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করে। তোমার গলার স্বর এত মিষ্টি, অথচ তুমি এমনভাবে গান গাইছিলে, যেন কেউ শুনে ফেললেই বিপদ! তাই ভাবলাম, তোমার পরিবার হয়তো তোমার এই দিকটা খুব একটা পছন্দ করে না।”
কথাটা শুনে আরিশা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
আরিয়ান আবার বলল, “তবে আমি তোমার গান শুনতে রাজি আছি। যদিও আমাদের তেমন পরিচয় হয়নি, তাই আমার প্রশংসা শুনে তোমার বিরক্তও লাগতে পারে। আচ্ছা, আমি কি একটু বেশিই কথা বলি?”
“হয়তো,” আরিশা মৃদু হেসে বলল।
দুজনেই হেসে উঠল।
কথা বলতে বলতে আরিশা নিজেও একটু সহজ হয়ে এল। একসময় সে বলল, “আমার মা-বাবা অনেক কঠোর। বিশেষ করে পড়াশোনার ব্যাপারে—ভালো রেজাল্ট ছাড়া তারা আর কিছুই বোঝে না।”
“হ্যাঁ, বুঝতে পারছি,” আরিয়ান মাথা নেড়ে বলল। “আমার পরিবারও প্রায় একই রকম। পরীক্ষার ফলাফলটাই যেন সবকিছু। তুমি কেমন আছ, কী ভাবছ, কী করতে ভালোবাসো—এসব জানার প্রয়োজন যেন কারও নেই।”
আরিশা চুপচাপ তার কথা শুনতে লাগল।
আরিয়ান একটু থেমে আবার বলল, “আসলে জানো, মানুষের জীবনে এমন একটা জায়গা থাকা দরকার, যেখানে তাকে প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রমাণ করতে হয় না। যেখানে অন্যের প্রত্যাশা পূরণের জন্য কিংবা কারও মন জোগানোর জন্য কিছু করতে হয় না। যেখানে সে নিজের পছন্দের কাজগুলো নিজের আনন্দের জন্য করতে পারে। অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও, যেখানে সে শুধু নিজের মতো করে বাঁচতে পারে।”
কথাগুলো শুনে আরিশার বুকের ভেতর কেমন যেন একটা অনুভূতি জেগে উঠল। এত দিন ধরে তার মনের মধ্যে জমে থাকা কথাগুলো যেন অন্য কেউ তার হয়ে বলে দিল। যে অনুভূতিগুলোকে সে নিজেই ঠিকমতো ভাষায় প্রকাশ করতে পারত না, সেগুলোই আরিয়ানের মুখে শুনে তার মনে হলো—পৃথিবীতে অন্তত একজন মানুষ আছে, যে তার না-বলা কথাগুলোও বুঝতে পারে।
আরিয়ানের কথাগুলো তার কাছে একই সঙ্গে নতুন ও বাস্তব মনে হলো। নতুন, কারণ এর আগে কেউ তাকে এভাবে ভাবতে শেখায়নি। আর বাস্তব, কারণ কথাগুলোর প্রতিটিই যেন তার নিজের জীবনের সঙ্গে মিলে যায়।
ক্লাস শেষ হওয়ার পরও তারা কিছুক্ষণ একসঙ্গে সময় কাটাল। টুকটাক কথাবার্তা, হাসি-ঠাট্টা আর নিজেদের জীবনের ছোটখাটো অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে নিতে কখন যে সময় পেরিয়ে গেল, আরিশা খেয়ালই করল না।
বাড়ি ফেরার সময় তার মনে হলো, দিনটা অন্য দিনের মতো কাটেনি। সেই একই কলেজ, একই ক্লাস, একই বেঞ্চ—অথচ কোথাও যেন সামান্য একটা পরিবর্তন ঘটে গেছে।
আরিয়ান নামের ছেলেটির সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। তবু কেন জানি মনে হচ্ছিল, এত দিন ধরে নিজের ভেতরে যে কথাগুলো সে একা একা বয়ে বেড়িয়েছে, সেগুলো বলার মতো একজন মানুষ হয়তো অবশেষে সে খুঁজে পেয়েছে। আর এভাবেই, খুব সাধারণ একটি দিনের মধ্যে, আরিশার জীবনে এক নতুন সম্পর্কের সূচনা হলো।